সকালের নরম আলোয় যখন শহর ঘুম থেকে জাগে, তখন কোনো এক গাছের ডালে বসে শোনা যায় মিষ্টি সুরে ডাকে— “চিক চিক, দোয়েল, দোয়েল”। এই পরিচিত সুরই যেন বাংলার ভোরের প্রথম আহ্বান। এই পাখিটিই আমাদের জাতীয় পাখি—দোয়েল, যা শুধু প্রকৃতির নয়, আমাদের সংস্কৃতিরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দোয়েল ছোট আকৃতির এই পাখিটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি কণ্ঠেও অপূর্ব সুরেলা। দোয়েল পাখির দেহের ওপরের অংশ কালো, বুক ও পেট সাদা, আর লেজের অংশ উঁচু করে ধরে হাঁটে—যেন গর্বিত এক শিল্পী। পুরুষ দোয়েল ঝকঝকে কালো রঙের হয়, আর স্ত্রী দোয়েলের রঙ কিছুটা ধূসর।
এরা সাধারণত একাকী বা জোড়ায় বসবাস করে—গ্রামাঞ্চলের গাছ, বাগান কিংবা বাড়ির আঙিনায়। বিশেষ করে বর্ষা আর বসন্তকালে দোয়েলের কণ্ঠে ভরে ওঠে প্রকৃতি।

বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিতে দোয়েলের স্থান: দোয়েল শুধু পাখি নয়—এটি বাংলার গ্রামীণ জীবনের প্রতীক। গ্রামে সকালে গৃহস্থের উঠানে বা বাঁশঝাড়ে বসে এদের গান যেন এক প্রাকৃতিক অ্যালার্ম ঘড়ি।
বাংলা কবিতা, গান ও প্রবাদেও দোয়েল এক অমর চরিত্র— “দোয়েল ডাকে সকাল বেলা, মধুর কণ্ঠে গায় সে মেলা।”
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশেই রয়েছে ‘দোয়েল চত্বর’, যা এ পাখির নামেই পরিচিত। এটি শুধু একটি স্থান নয়, জাতীয় পরিচয়ের অংশও বটে।
দোয়েলের বাসস্থান ও অভ্যাস: দোয়েল সাধারণত উঁচু গাছের ফোকরে বা পুরনো দেয়ালের গর্তে বাসা বাঁধে। স্ত্রী দোয়েল একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। এদের খাদ্য তালিকায় থাকে কীটপতঙ্গ, পিঁপড়া, ছোট ছোট পোকা, আর মাঝে মাঝে শস্যের দানা। দোয়েল বুদ্ধিমান ও পরিচ্ছন্ন পাখি—নিজের বাসা নিয়মিত পরিষ্কার রাখে এবং ছানাদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল।
সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা: দ্রুত নগরায়ন, গাছপালা ধ্বংস, এবং কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দোয়েলের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে, দোয়েলকে রক্ষা করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং এদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে।
বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী দোয়েল হত্যা বা আটক নিষিদ্ধ।
দোয়েল আমাদের মাটির গান, আমাদের সকালের প্রতিধ্বনি। এই ছোট্ট পাখির সুরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পরিচয়—প্রকৃতি, সঙ্গীত আর জীবনের ছন্দ।
যেদিন এই পাখির কণ্ঠ হারিয়ে যাবে, সেদিন হারাবে আমাদের এক টুকরো সুরেলা সকাল।
বিশেষ ফিচারটি লিখেছেনঃ মুদাচ্ছির রহমান সিরাজী
এলএনডি/এমআর






