আজ ১১ অক্টোবর—আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। প্রতিটি কন্যা শিশু জন্মের পর থেকেই একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা। কিন্তু সমাজের বহু স্তরে এখনো কন্যা শিশুরা নানা অবহেলা, বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার। তাদের স্বপ্ন থেমে যায় অল্প বয়সে বাল্যবিবাহের ঘেরাটোপে, কিংবা পরিবারের আর্থিক অক্ষমতায়।
বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়লেও, বাস্তবতা এখনো কঠিন। গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক পরিবারে এখনো মনে করা হয়, মেয়ের বেশি পড়াশোনার দরকার নেই—বিয়েই তার ভবিষ্যৎ। অথচ একজন কন্যা শিশুর শিক্ষাই হতে পারে একটি পরিবারের, এমনকি একটি জাতির মুক্তির চাবিকাঠি।
খুলনার কয়রার নদীঘেঁষা গ্রামের স্কুলপড়ুয়া তাসলিমা প্রতিদিন সকালে নৌকায় চড়ে স্কুলে যায়। তার চোখে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতার দেয়াল অনেক উঁচু—বন্যা, দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ। তবুও সে হাল ছাড়ে না। তাসলিমার মতো হাজারো মেয়ের এই দৃঢ়তা প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে কন্যা শিশুরা পারে ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।
বিশ্বের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ জানিয়েছে, এখনো কোটি কোটি কন্যা শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অনেক দেশে মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার আগেই হয় বাল্যবিবাহের শিকার। কেউ কেউ বাধ্য হয় শিশু শ্রমে বা নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন কাটাতে। এই বাস্তবতা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মানবতার জন্য এক সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি, বিনা খরচে বই বিতরণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনি উদ্যোগ—এসবই ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু সমস্যা এখনো শেষ হয়নি। অনেক সময় কন্যা শিশুর প্রতি পরিবারের মনোভাবই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ মনে করে মেয়ে সন্তান মানেই ‘দায়’। এই ধারণাই আমাদের সামাজিক উন্নতির সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
ইসলাম কন্যা শিশুর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের যে শিক্ষা দিয়েছে, তা যুগে যুগে মানবতার আলো ছড়িয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করে, তাদের ভালোভাবে শিক্ষা দেয়, এবং বিবাহের ব্যবস্থা করে, সে জান্নাত লাভ করবে।”
আরেক হাদিসে তিনি বলেন, “যে কন্যা সন্তানকে অপছন্দ না করে ধৈর্যসহকারে তার লালন-পালন করে, আল্লাহ তা আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।”
এই হাদিসগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইসলামে কন্যা সন্তান শুধু আশীর্বাদ নয়, জান্নাতের চাবিকাঠি। তাই যারা কন্যা শিশুর লালন-পালনে ভালোবাসা ও দায়িত্ব দেখায়, তারা পৃথিবী ও পরকালে সম্মানিত হয়।
একটি কন্যা শিশুর উন্নতি কেবল তার নিজের নয়, পুরো সমাজের উন্নতি। সে যদি শিক্ষিত হয়, সে হবে সচেতন মা, দায়িত্ববান নাগরিক এবং সমাজের পরিবর্তনের চালিকা শক্তি। কিন্তু যদি তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে সমাজ পিছিয়ে যাবে এক প্রজন্ম।
কন্যা শিশুর ক্ষমতায়ন মানে কেবল তাকে স্কুলে পাঠানো নয়; তাকে আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে তোলা। পরিবার থেকেই শুরু হতে হবে এই পরিবর্তন। বাবা-মা যদি মেয়েকে বোঝা মনে না করে আশীর্বাদ মনে করেন, তাহলে সমাজ বদলাতে বেশি সময় লাগবে না।
আমাদের সমাজে এখনো মেয়েদের চলাফেরা, পোশাক, শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা তৈরি হয়। অথচ একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা সমাজেরই দায়িত্ব। প্রতিটি স্কুল, কর্মস্থল ও জনসমাগমস্থল হতে হবে কন্যা শিশুদের জন্য নিরাপদ।
এই পরিবর্তন শুরু করতে হবে মানসিকতা থেকে। সমাজে এখনো এমন অনেক ধারণা টিকে আছে—‘ছেলে হলে ভালো, মেয়ে হলে বোঝা।’ এই মানসিকতা দূর না হলে কোনো আইন বা প্রকল্প দিয়ে কন্যা শিশুর জীবন বদলানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান ও সচেতনতা।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কন্যা শিশুদের নিয়ে প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি চলছে। তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখাচ্ছে। অনেক কন্যা এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছে। এটাই প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে মেয়েরা পিছিয়ে থাকে না, তারা এগিয়ে যায় সাহসের সাথে।
তবুও বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যতক্ষণ না প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি পরিবার কন্যা শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, ততক্ষণ আমাদের পথচলা শেষ নয়।
আজ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসে আমাদের শপথ হোক—কন্যা শিশুদের হাসি যেন আর কোনো অন্ধকারে ঢাকা না পড়ে। তাদের জন্য তৈরি হোক এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মেয়ের স্বপ্নের মূল্য থাকবে, সম্মান থাকবে, নিরাপত্তা থাকবে।
কন্যা শিশুরা আমাদের ভবিষ্যতের আলো। তারা মায়ের কোলে, ক্লাসরুমে, খেলাধুলায় বা কর্মক্ষেত্রে—যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের হাসি হোক নিরাপত্তার প্রতীক, তাদের চোখে জ্বলুক আশার দীপ্তি।
আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস শুধু একটি তারিখ নয়—এটি এক আত্মজিজ্ঞাসা, এক দায়বদ্ধতার দিন। আমরা কি আমাদের কন্যাদের যথেষ্ট নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুযোগপূর্ণ জীবন দিতে পেরেছি? আজ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—“একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন সেখানে কন্যা শিশুরা নিরাপদে হাসতে পারে।” তাদের হাসিই হোক আমাদের আলোর প্রতিশ্রুতি।
বিশেষ ফিচারটি লিখেছেন তারিক লিটু
এলএনডি/এমআর






