চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থায় তেল পরিবহনের ফলে সময় ও ব্যয়—দুটোই সাশ্রয় হবে।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় পদ্মা ওয়েল কোম্পানির ডেসপাস টার্মিনালে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাবে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ট্যাংকারে তেল পরিবহনে বছরে প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা খরচ হতো। নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে একই পরিমাণ তেল পরিবহনে খরচ হবে মাত্র ৯০ কোটি টাকা। ফলে বছরে অন্তত ২২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হবে। পাশাপাশি সিস্টেম লস ও চুরি প্রতিরোধের কারণে সাশ্রয়ের পরিমাণ বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সহায়তায় নির্মিত এই ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনটির দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার। এটি চট্টগ্রাম থেকে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। পাইপলাইনটি ২২টি নদী ও খাল অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নয়টি স্টেশন ও আধুনিক ডিপো।
এই পাইপলাইন ব্যবহার করে তিনটি বিপণন কোম্পানি তেল সরবরাহ করবে। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বরুড়া হয়ে তেল পৌঁছাবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ঢাকার ফতুল্লায়। কুমিল্লায় নির্মিত অটোমেটেড ডিপো থেকে চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশপাশের অঞ্চলে তেল সরবরাহ করা হবে। ডিপোতে তেলের ওজন, তাপমাত্রা ও সরবরাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হবে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তির মাধ্যমে।
বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানির চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৩০ লাখ টন ব্যবহার হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এতদিন এসব তেল নৌপথে ট্যাংকারে পরিবাহিত হতো, যেখানে অনিয়ম ও চুরি ব্যাপকভাবে ঘটত। এছাড়া ট্যাংকার পরিবহনে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নিত, যা বছরে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিতে দাঁড়াত। এই সমস্যা সমাধানেই মূলত পাইপলাইন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল।
নতুন ব্যবস্থায় প্রতি ঘণ্টায় ৩৫০ মেট্রিকটন এবং বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ মেট্রিকটন তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে। আগে নৌপথে ট্যাংকারে নিতে সময় লাগত প্রায় ৪৮ ঘণ্টা, এখন তা কমে ১২ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। ফলে বার্ষিক পরিবহন খরচও ৩২৬ কোটি টাকা থেকে নেমে আসবে মাত্র ৯০ কোটিতে।
পতেঙ্গায় খোলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পুরো পরিবহন কার্যক্রম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুল হক জানান, পরীক্ষামূলকভাবে ইতোমধ্যে ৫ কোটি লিটার ডিজেল কোনো ক্ষতি ছাড়াই পরিবহন সফল হয়েছে। এখন রিজার্ভার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ডিপোতে দ্রুত ও নিরাপদে তেল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
২০১৮ সালে ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকার অনুমোদিত এ প্রকল্প করোনা পরিস্থিতির কারণে বিলম্বিত হয়ে চলতি বছরের মার্চে সম্পন্ন হয়। শেষে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা।
এলএনডি/এমআর






