১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। সদ্য স্বীকৃত ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ তখন মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করছে। যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তির হাওয়া বইতে থাকে। এদিকে অনিবার্য পরাজয়ের আশঙ্কায় পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৎপরতা বাড়ায় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা চলতে থাকে।
এই দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি যশোর পতন হয়। এর পরপরই ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, সিলেটসহ একাধিক অঞ্চল মুক্ত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে; দুই শতাধিক সেনা এবং কয়েকজন কর্মকর্তা আত্মসমর্পণ করেন। যশোরের পর সিলেটও মুক্ত হয়। প্রথমেই যৌথ বাহিনী সিলেটের শালুটিকর বিমানবন্দর (বর্তমান ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) দখলে নেয়। সেখানে ছত্রীসেনা নামানো হয় এবং চার দিক থেকে শহরের দিকে অগ্রযাত্রা শুরু হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে পাকিস্তানি বাহিনী মেঘনার ওপারে ভৈরব বাজারে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। একই দিনে চুয়াডাঙ্গা, শেরপুর, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, নেত্রকোনার কেন্দুয়া ও কলমাকান্দা, বাগেরহাটের মোংলা, বরিশালের বাকেরগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের দিরাই মুক্ত হয়।
দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেদিন রেডিও ভাষণে আশ্বস্ত করে বলেন, ঢাকার মুক্তি আর বেশি দূরে নয়। তিনি বিশ্বব্যাপী সব দেশের প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। মুজিবনগর সরকারের এক মুখপাত্র জানান, ভারতের স্বীকৃতির পর মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে—ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকারের সদর দপ্তর মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হবে এবং সরকার ‘গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবে।
৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আর্জেন্টিনা সীমান্তের দুই পাশে সেনা প্রত্যাহার ও অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব তোলে। নিরাপত্তা পরিষদেও অনুরূপ প্রস্তাব ওঠে, তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোয় তা বাতিল হয়ে সাধারণ পরিষদে পাঠানো হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত ভারতের আরেক প্রস্তাব ছিল বিষয়টি কার্যপরিচালনা কমিটিতে পাঠিয়ে পুনর্বিবেচনা করা।
জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট সংঘাতের মানবিক দিক নিয়ে বিবৃতি দেন। পরে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়—যার বাধ্যবাধকতা ছিল না। এতে পক্ষে ভোট পড়ে ১০৪টি, বিপক্ষে ১১টি। চীন ভারতের ভূমিকার সমালোচনা করে আরেকটি প্রস্তাব আনে, সোভিয়েত ইউনিয়নও পৃথক প্রস্তাব দেয়; কোনোটিই ভোটাভুটির পর্যায়ে যায়নি।
এর আগেই ভারত সাধারণ পরিষদের জরুরি অধিবেশনে দাবি জানায়—বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রসঙ্গে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, যদি বাংলাদেশ সরকার এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে না করে, তবে সেটি কার্যকর করাও সম্ভব নয়।
এলএনডি/এমআর






