শরতের শান্ত ভোরে ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশে যেন হঠাৎ খুলে গেল এক স্বর্গীয় পর্দা। উত্তরের দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা ধূসর মেঘের আড়াল ভেদ করে উঁকি দিল বরফে মোড়ানো কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেই মুহূর্তের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলো পুরো জেলা, বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ল জনে জনে।
বছরের গুটিকয়েক দিনে, বিশেষত শরতের মেঘমুক্ত সকালেই কেবল বাংলাদেশের মাটি থেকে হিমালয়ের এই মহিমান্বিত চূড়া দেখা যায়। দীর্ঘদিনের মেঘলা আকাশ সরে গিয়ে শুক্রবার ভোরে সেই বিরল সুযোগ এনে দেয় প্রকৃতি।
সদর উপজেলার বুড়িরবাঁধ, চিলারং ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বালিয়াডাঙ্গীর লাহিড়ী ফাঁসিদহ—বিভিন্ন এলাকার মানুষ দল বেঁধে ছুটে আসে এই রূপলোকের সাক্ষী হতে। কেউ মোবাইল হাতে, কেউ ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দূরের বরফঢাকা চূড়ার দিকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি ও ভিডিওতে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই যেন এক মুহূর্তে হারিয়ে যায় প্রকৃতির অপার্থিব রূপে। চোখে মুখে আনন্দ, বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতার ছাপ।
বুড়িরবাঁধের স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম বললেন, “বইয়ে পড়েছি, ছবিতে দেখেছি, কিন্তু চোখের সামনে এত স্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখব—ভাবিনি কখনও। এই দৃশ্য যেন সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল।”
স্থানীয় তরুণী মৌসুমী আক্তার বলেন, “মনে হচ্ছে স্বপ্নের মতো—হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। ক্যামেরায় এই অনুভূতি ধরা যায় না; চোখে দেখার আনন্দের তুলনা নেই।”
বালিয়াডাঙ্গীর কলেজছাত্র রিয়াজুল ইসলাম লাইভে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “অনেকে বিশ্বাস করেন না যে বাংলাদেশ থেকে হিমালয় দেখা যায়। আজ নিজের চোখে প্রমাণ পেলাম। বরফের ঝলক, আকাশের নীল আর রক্তিম আভা—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা।”
স্থানীয় ফটোগ্রাফার আব্দুস শাহীন জানান, সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যেই ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের সেরা সময়। “দূর আকাশে বরফে মোড়ানো শিখরগুলো যেন কোনো চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়ে গড়া জীবন্ত ক্যানভাস,” বলেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, “আজ সকালে পুরো শহর যেন উৎসবে মেতে উঠেছিল। সবাই মোবাইল হাতে ছবি তুলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নিচ্ছেন প্রকৃতির এই উপহার।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, “কয়েকদিন মেঘাচ্ছন্ন থাকার পর আজ আকাশ ছিল সম্পূর্ণ পরিষ্কার। শরতের এই সময়েই এমন দৃশ্য দেখা যায়, যা প্রকৃতির এক বিরল উপহার।”
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, “পরিবেশ যদি পরিচ্ছন্ন থাকে, এমন সৌন্দর্য আমরা আবারও উপভোগ করতে পারব। প্রকৃতির এই দৃশ্য মানুষের মুখে হাসি আর হৃদয়ে শান্তি এনে দেয়।”
শরতের নীল আকাশ আর স্নিগ্ধ আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার এই উঁকি হয়ে রইল ঠাকুরগাঁওবাসীর স্মৃতিতে এক অবিস্মরণীয় সকাল, যেখানে প্রকৃতি নিজেই আঁকল আনন্দের ক্যানভাস।
এলএনডি/এমআর






