সুন্দরবনের ভেতর গভীর দুপুর। চারপাশে একধরনের থমথমে নিরবতা। মাঝেমধ্যে শোনা যায় পানির কুলুকুলু শব্দ, গাছের পাতায় বাতাসের নরম ছোঁয়া, কোথাও হরিণের হালকা ডাক কিংবা গাছে বাঁদরের লাফালাফি। কিন্তু এই বনের যিনি প্রকৃত শাসক, সেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন তা আর তেমন শোনা যায় না। নিস্তব্ধতার মাঝখানে যেটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায়, তা হলো এই অনুপস্থিতির শব্দ একটা শূন্যতা, ভয়ংকর রকমের শূন্যতা।
আজ ২৯ জুলাই, আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। এ দিনে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাঘ নিয়ে সচেতনতা ও সংরক্ষণের কথা হয়। বাংলাদেশেও হয়, বিশেষ করে সুন্দরবনকে ঘিরে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আলোচনা ও প্রতিশ্রুতি কতটা কাজে লাগছে? এই বন, এই প্রাণ, এই প্রতীক সব কিছুর কেন্দ্রে যে প্রাণীটি, সেই বাঘ আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে। এক সময় যার গর্জনে কেঁপে উঠত বনজ জীবন, এখন সেই গর্জনই হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
স্মরণযোগ্য একটি সরকারি হিসাব ২০০৪ সালের, যেখানে দেখা যায়, সুন্দরবনে বাঘ ছিল প্রায় ৪৪০টি। তারও আগে সংখ্যাটি হয়তো ৫০০-এর কাছাকাছি ছিল। এরপর এসেছে একের পর এক সংকট। ২০১৫ সালের একটি ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপে দেখা যায়, বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০৬-এ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টি। যদিও এই পাঁচ বছরে নতুন করে কোনো গণনা হয়নি, কিন্তু বাস্তবতার চিত্র বলছে সংখ্যাটা আরও কমেছে বলেই আশঙ্কা।
এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি অশনি সংকেত। কেননা সুন্দরবনের বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। হরিণ, শূকরসহ মাঝারি স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে সে। বাঘ না থাকলে এদের জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে বনজ সম্পদ ধ্বংস করে দেবে। এর ফলে বন যেমন নষ্ট হবে, উপকূলীয় এলাকাও হয়ে উঠবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
বনবিভাগ, গবেষক এবং স্থানীয়রা বলছেন, চোরাশিকার, বন উজাড়, বন্যপ্রাণ পাচার, নদী শুকিয়ে যাওয়া, খাদ্য ঘাটতি সব মিলিয়ে বাঘ আজ বিপন্ন। বাঘের মূল খাদ্য চিত্রল হরিণের সংখ্যাও কমেছে। বনাঞ্চলের ভেতরে চিংড়ি ঘের, কাঠ পাচার, কয়লার চুল্লি এসব মিলে বাঘের চলাফেরার পথ সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। উপরে লবণাক্ততার চাপে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক খাবার, নিচে মানুষ ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
জেলেরা বলেন, আগে সুন্দরবনের ভেতরে মাছ ধরতে গেলে দূর থেকে বাঘের আওয়াজে পিছিয়ে আসতেন। এখন আর সেই ভয় নেই। কারণ, এখন আর তেমন গর্জন শোনা যায় না। ভয়হীনতা যেন এক অস্বাভাবিক স্বস্তি যেখানে বাঘ নেই, সেখানে বনও নিরাপদ নয়।
২০০৭ সালের সিডর কিংবা ২০০৯-এর আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের সময় সুন্দরবন ছিল উপকূলের জীবন্ত ঢাল। কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছিল বনের জন্য। সেই বন রক্ষা করতে হলে বাঘ রক্ষা করতে হবে,এ সত্য আমরা কি বুঝতে পারছি?
সরকার বলছে, ‘স্মার্ট প্যাট্রোলিং’, ‘টিআইজি’ ক্যামেরা ট্র্যাপ, বনরক্ষীদের প্রশিক্ষণসহ নানা কার্যক্রম চলছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বন সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বনরক্ষীদের সরঞ্জাম অপর্যাপ্ত, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা কম, আর প্রকল্পের আয়ু বেশিরভাগ সময়ই প্রাসাদোপম পত্রিকায় সীমাবদ্ধ থাকে।
বাঘকে বাঁচাতে হলে কেবল সরকারের নয়, মানুষেরও ভূমিকা জরুরি। বনজীবী মানুষদের জন্য বিকল্প আয়বর্ধনমূলক কর্মসূচি না দিলে তারা বাধ্য হয়েই বনে যাবে। সেখানে বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষ বাড়বে, আবারও মানুষ মরবে, বাঘও মরবে। আর এই চক্র একদিন পুরো প্রজাতিটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
আজ বাঘ দিবসে তাই প্রশ্নটা খুব স্পষ্ট, আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য একটি নিস্তব্ধ, গর্জনহীন সুন্দরবন রেখে যেতে চাই? নাকি আমরা এখনও সময় থাকতে জেগে উঠব, কাজ করব, রক্ষা করব এই অমূল্য প্রাণকে?
বাঘের গর্জন কেবল ভয় নয়, এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ঘোষণা। সেই গর্জন যদি একদিন চিরতরে থেমে যায়,তাহলে থেমে যাবে আমাদেরও এক অংশ। সময় হাতে আর বেশি নেই।
বিশেষ ফিচারটি লিখেছেন -তারিক লিটু
For 24/7 breaking news:
🌐 English News – www.libertynewsbd.com
🌐 বাংলা সংবাদ – bangla.libertynewsbd.com
📌 Facebook – www.facebook.com/libertynewsbd/
📌 Facebook (বাংলা) – www.facebook.com/libertynewsbangla/
📌 X (Twitter) – www.x.com/libertynewsbd
📌 Instagram – www.instagram.com/libertynewsbd
📌 YouTube – www.youtube.com/@LibertyNewsBD






